যোগাযোগঃ +৯১ ৯৯০৩৭ ৬৬৩৫৫
ই-মেইলঃ grievance@sonjog.in

চারদিক > বিস্তারিত

ফিরে আসার স্বপ্নের কাছে কাঁটাতার তুচ্ছ



শোয়েব আখতার মোল্যা




অভিনয়: নাসিরুদ্দিন শাহ্‌, রজত কাপুর, শারভারি ওয়াঘ, দিলজিৎ দোসাঞ্জ
পরিচালনা: ইমতিয়াজ আলি
সঙ্গীত পরিচালনা: এ আর রহমান

আমরা প্রত্যেকেই জীবনে কোথাও না কোথাও ফিরে যেতে চাই। কেউ ফিরে যেতে চান শৈশবের বাড়িতে, কেউ পুরোনো শহরের গলিতে, কেউ প্রথম প্রেমের কাছে, কেউ আবার এমন একজন মানুষের কাছে - যাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার পথ বহুদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ আশ্চর্য, মানুষের জীবনে কিছু দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও স্মৃতির দরজা কখনও পুরোপুরি বন্ধ হয় না। সেখানে আলো থাকে। কেউ কেউ সেই আলোর কাছে সারাজীবন বসে থাকেন।

ইমতিয়াজ আলির 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' (Main Vaapas Aaunga) মূলত সেই অপেক্ষার গল্প। ছবির শুরুতেই আমরা দেখতে পাই বৃদ্ধ ইশার সিং-কে। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষ, যাঁর শরীর বর্তমানের মধ্যে, অথচ মন বারবার ফিরে যাচ্ছে বহু দূরের এক অতীতে। ১৯৪৭-এর দেশভাগ, হারিয়ে যাওয়া ঘর, অসমাপ্ত প্রেম এবং এক জীবনের অপরাধবোধ - সব মিলিয়ে তাঁর স্মৃতি যেন একটি ভাঙা আয়না। সেই আয়নায় বর্তমানের মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু অতীতের মুখগুলি আশ্চর্যরকম উজ্জ্বল। তাঁর নাতি নির্ভয়ের ধীরে ধীরে সেই ভাঙা স্মৃতির টুকরোগুলি জুড়ে তাঁর দাদুর অজানা জীবনের কাছে পৌঁছতে থাকে।

এখানেই ছবিটির প্রথম বড় প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় - মানুষ কি সত্যিই তার অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে? সময় আমাদের শেখায় সামনে এগোতে। কিন্তু স্মৃতি কখনও কখনও আমাদের পিছনে টেনে ধরে। আমরা ভাবি, একটি ঘটনা পেরিয়ে গিয়েছে; অথচ মানুষের ভিতরে তার সময় থেমে থাকতে পারে। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ১৯৪৭ অনেক দূরে। কিন্তু একজন মানুষের হৃদয়ে ১৯৪৭ হয়তো এখনও গতকাল।

এই অর্থে 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' শুধু দেশভাগের ছবি নয়। এটি স্মৃতির ছবি। মানুষ কীভাবে স্মৃতি বহন করে - এই প্রশ্নটি মনোবিজ্ঞানের যেমন, তেমনই সাহিত্যেরও। মরিস হল্বওয়াচস আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, স্মৃতি কখনও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত নয়; পরিবার, সমাজ, সম্প্রদায় ও ইতিহাসের ভিতর দিয়েই ব্যক্তিগত স্মৃতির কাঠামো তৈরি হয়। ফলে একজন বৃদ্ধের স্মৃতির ভিতর কখনও কখনও একটি গোটা সময়ের ইতিহাস এসে বাসা বাঁধে।

ইশার সিংয়ের স্মৃতিও তাই কেবল তাঁর নিজের নয়। তাঁর হারানো বাড়ির সঙ্গে হারিয়ে গেছে একটি ভূগোল; তাঁর প্রেমের সঙ্গে হারিয়ে গেছে একটি সময়; আর তাঁর অপরাধবোধের সঙ্গে ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা এসে জড়িয়ে গেছে।দেশভাগকে আমরা সাধারণত মানচিত্রের ঘটনা হিসেবে পড়ি। দুটি দেশ তৈরি হয়েছিল, সীমান্ত টানা হয়েছিল, মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে গিয়েছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় - মানচিত্রে যে দাগ টানা হয়, তার শেষ প্রান্ত অনেক সময় মানুষের বুকের ভিতর। একটি সীমান্ত শুধু দুটি ভূখণ্ডকে আলাদা করে না; কখনও তা আলাদা করে দুই বন্ধু, দুই প্রেমিক, দুই পরিবার, এমনকি একজন মানুষকে তার নিজের অতীত থেকেও।



এই কারণেই ইশারের ফিরে যেতে চাওয়া এত গভীর। তিনি শুধু সরগোধায় ফিরতে চান না। তিনি আসলে ফিরতে চান সেই সময়ে, যখন তাঁর পৃথিবী এখনও সম্পূর্ণ ছিল। যখন বাড়ি মানে ছিল নিরাপত্তা, প্রেম মানে ছিল ভবিষ্যৎ, আর পরিচয় মানে ছিল বিভাজনের কোনও রেখা নয়।

কিন্তু জীবন কাউকে সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয় না। আমরা সবাই কোনও না কোনওভাবে এই অসম্ভব প্রত্যাবর্তনের যাত্রী। মানুষের ভিতরে কিছু কিছু সম্পর্কের মৃত্যু হয় না। শুধু তাদের সঙ্গে আমাদের দৈনন্দিন যোগাযোগের মৃত্যু হয়।স্মৃতি তখন সম্পর্কের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। এই জায়গায় এসে ছবিটির প্রেমের গল্পটি আরও বড় হয়ে ওঠে। ইশার এবং আফসানার প্রেম কেবল দুটি মানুষের প্রেম নয়; ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অনুভূতির এক ক্ষুদ্র অথচ গভীর প্রতিরোধ। তাদের বিচ্ছেদ কোনও ব্যক্তিগত ভুলের ফল নয়। বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হিংসা এসে ব্যক্তিগত জীবনের দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ে। ইতিহাসের বইয়ে আমরা লিখি - Partition caused displacement, violence and migration. কিন্তু একটি সিনেমা আমাদের অন্যভাবে প্রশ্ন করতে পারে - 'তারপর?' যে মানুষটি বেঁচে গেল, তার ভিতরে কী হল? যে মেয়েটি তার বাড়িতে আর ফিরতে পারল না, তার স্মৃতির কী হল?যে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে হারাল, তার পরের সত্তর-আশি বছর কীভাবে কেটে গেল?

ইতিহাস ঘটনাকে গণনা করে। সাহিত্য মানুষের ক্ষতকে অনুভব করে। ছবিটি সেই দ্বিতীয় কাজটিই করতে চায়। এখানে নাসিরুদ্দিন শাহের অভিনয় ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি। বৃদ্ধের শরীরের দুর্বলতা, স্মৃতির অসংলগ্নতা, হঠাৎ অতীতে ফিরে যাওয়া - সবকিছুর মধ্যে অভিনেতা এমন এক অসহায় মানবিকতা তৈরি করেন, যা অনেক সময় সংলাপের চেয়েও বেশি কথা বলে। তাঁর চোখে যেন একজন মানুষের পাশাপাশি একটি হারিয়ে যাওয়া শতাব্দীও দেখা যায়। সমালোচকরাও তাঁর অভিনয়কে ছবিটির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু ছবিটির সবচেয়ে সুন্দর আবিষ্কার সম্ভবত 'অপেক্ষা'।আমরা ভালোবাসাকে সাধারণত পাওয়ার সঙ্গে যুক্ত করি। কাউকে ভালোবাসি মানে তাকে কাছে পেতে চাই। কিন্তু ভালোবাসার আরও একটি রূপ আছে - অপেক্ষা। অপেক্ষা এমন এক অনুভূতি, যার কোনও নিশ্চয়তা নেই। যে মানুষটির জন্য অপেক্ষা করছি, সে ফিরবে কি না জানি না। তবু দরজা বন্ধ করি না। সম্ভবত এই কারণেই ছবির নাম - 'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা'। 'আমি ফিরে আসব' - এই বাক্যটি প্রথমে একটি প্রতিশ্রুতির মতো শোনায়। কিন্তু ছবিটি যত এগোয়, বাক্যটির অর্থ বদলাতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এটি শুধু ফিরে আসার কথা নয়; এটি স্মৃতির কাছে ফিরে আসার কথা, নিজের অপরাধবোধের কাছে ফিরে আসার কথা, হারিয়ে যাওয়া প্রেমের কাছে ফিরে আসার কথা।

ইমতিয়াজ আলির সিনেমাগুলির একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন এখানেই - মানুষ আসলে কোথায় বাড়ি খোঁজে? একটি শহরে? একটি মানুষের কাছে?একটি সম্পর্কে?নাকি নিজের ভিতরে? এই ছবিতে এই প্রশ্নটি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে, কারণ ইশারের কাছে 'বাড়ি' আর বাস্তব কোনও স্থান নয়। সেটি এখন স্মৃতি। জীবনে কতবার আমরা নিজেদের পুরোনো সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই! আমাদের মধ্যেও কতগুলি দেশভাগ ঘটে যায় - কেউ জানে না। একটি মানুষ দুই ভাগ হয়ে যায় - একটি অংশ বেঁচে থাকে বর্তমানের সঙ্গে, অন্যটি আটকে থাকে অতীতে। তাই ছবিটি দেখার পর প্রশ্নটি হয়তো হওয়া উচিত নয় - ছবিটি কতটা ভালো? প্রশ্নটি বরং হওয়া উচিত - ছবিটি শেষ হওয়ার পরে আমার ভিতরে কে ফিরে এলো? কোনও পুরোনো মুখ?কোনও ভুলে যাওয়া বিকেল? কোনও অসমাপ্ত কথা?কোনও বাড়ি?নাকি আমার নিজের সেই মানুষটি, যাকে জীবনযাত্রার ব্যস্ততায় কোথাও ফেলে এসেছি?

'ম্যায় ওয়াপাস আউঙ্গা' সেই দরজাটির কথাই মনে করিয়ে দেয় - হয়তো 'আমি ফিরে আসব' কোনও প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি নয়। হয়তো এটি মানুষের স্মৃতির কাছে করা শেষ প্রতিশ্রুতি - যে পৃথিবী আমাকে যত দূরেই নিয়ে যাক, আমি একদিন অন্তত মনে মনে ফিরে আসব।